কাঞ্চনজঙ্ঘা

যতবার পাহাড়ে যাই সব সময় একটা টেনশন কাজ করে ওর সাথে দেখা হবে তো? প্রতিবার যখন যাই দেখা ঠিক হয় এবারও যখন নভেম্বর মাসে গেলাম তখন ভাবলাম যে এবারে দেখা হবে তো? প্রথমেই আমরা গিয়েছিলাম সিটং বলে একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে। পাইন গাছে ঢাকা আর প্রচুর কমলালেবুর বাগান দিয়ে ঘেরা ।খুব সুন্দর লেগেছিল প্রথম দ্বিতীয় দিন ঘুরে বেড়ালাম পাইন বোনের মধ্যে দিয়ে কমলা লেবুর গন্ধ শুঁকে আর নদীর কুল কুলু আওয়াজ শুনে কিন্তু তার সাথে দেখা হলো না। মনটা একটু ভারাক্রান্ত ছিল সেদিন রাত গেল পরের দিন ছেড়ে চলে যাব কি হবে? ওর সাথে তো এখনও দেখা হলো না । কাল যদি তোমার সাথে দেখা না হয় তাহলে কিন্তু আর কখনো আসবো না। ভোর বেলা যখন ঘুম ভাঙ্গলো অবাক হয়ে গেলাম জানলার পর্দা সরিয়ে দেখি ওই তো তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার জন্য কি ভাল লাগছে তোমায়। বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে বারান্দায়। বারান্দা থেকে ছাদে ।তোমায় দেখে যেন সাধ মিটছে না কি সুন্দর লাগছে ।এবার তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাই আমার দেখা হয়ে গেছে তোমার সাথে আর কোন দুঃখ নেই ।এবার স্নান সেরে খাওয়া সেরে pine tree resort কে বিদায় জানিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম । ঝকঝকে আকাশ পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর উঁকিঝুঁকি মারছে। রাস্তার প্রতিটা বাঁকে একটা করে চমক খুব ভালো লাগছিল ।মনে মনে হচ্ছিল ভগবান তুমি কি এত সুন্দর রূপ দেখার জন্যই আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে? তারপর সেই চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে পাইন গাছের গা ঘেঁষে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম লামাহাটা। সুন্দর একটা বাগান ।মানুষের তৈরি কিন্তু ভীষণ সুন্দর। তারপর দেখলাম দূরে তুমি দিগন্তবিস্তৃত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো—– আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা। রদ্দুরে ঝলমল করছো তুমি। চোখ সরাতে ইচ্ছা করছিল না কিন্তু এদিকেও খুব সুন্দর পাইনের জঙ্গল তারপর আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গেছে বাগান খুব ভালো লাগছিল। যেখান থেকেই তোমায় দেখা যাচ্ছিল প্রাণ ভরে দেখছিলাম কি জানি কাল যদি আবার না দেখা হয় তোমার সাথে ।তারপর ড্রাইভার ভাই তারা দিল বলল চলুন না হলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে ।যাব আমরা তিনচুলে। ওখান থেকে তোমায় দেখতে পাবো তো? যাচ্ছি যাচ্ছি যাচ্ছি আরো অনেকটা যাবার পর তিনচুলে যখন এলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে কই তোমায় আর দেখছি নাতো কিন্তু আকাশ তো পরিষ্কার জানি না এখান থেকে তোমায় কত ভাল দেখব ড্রাইভারকে বললাম এখান থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজ্ঘা? বলল হ্যাঁ যায় যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে তাহলে আপনাকে আমি নিয়ে যাব কাল ভোরে এসে আমি বললাম দেখো ভাই আকাশ কিন্তু পরিষ্কার থাকবেই থাকবে আমি জানি। ড্রাইভার ভাই চলে গেল। পরম যত্নে হুমর গেস্ট হাউসে রাই সাহেব আমাদের রাতের ডিনার দিলেন। কম্বলের তলায় গিয়ে বললাম

তোমার সাথে কাল যেনো দেখা হয় তুমি কিন্তু আমায় সুপ্রভাত বলবেই বলবে বলে শুয়ে পড়লাম। রায় সাহেব বলেছিলেন তার আগে যে ম্যাডাম ওইখান থেকে আপনি দেখতে পাবেন আমি ভেবেছিলাম কার কথা বলছে কাঞ্চনজংগা নেইতো বললেন কিন্তু সূর্যকে দারুন দেখবেন ।এটা দেখুন একবার কি রকম লাগে আমি বললাম ঠিক আছে বলে আমরা শুয়ে পড়লাম। আমার তো ঘুম ভেঙে গেল ভোর চারটে তখন থেকে বসে আছি কি দেখবো? সূর্যোদয় তো অনেক জায়গা থেকে দেখেছি কি এমন আছে তার জন্য কাঞ্চনঙ্ঘা কেতো দেখবো না কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম সেই দৃশ্য দেখে ।অপূর্ব সেই আলো । তারপর আস্তে আস্তে কমলা কমলার পর হলুদ হলুদ থেকে আরো হলুদ আর তারপর উঠে পড়লেন সূর্যদেব পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ।অপূর্ব দৃশ্য আর তার ঠিক নিচে মেঘের সমুদ্র ।কি অসাধারণ লাগছে আমি হা করে তাকিয়ে আছি আর কত দেখব প্রভু তোমার সৃষ্টি তোমার সৌন্দর্য বলে বোঝাতে পারব না হঠাৎ দিদি যাবেন নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে ড্রাইভার ভাইএসে হাজির ।হ্যাঁ নিশ্চয়ই যাব কোনরকম কম্বল জড়িয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে তারপর চলল গাড়ি আস্তে আস্তে এসে দাঁড়ালো অনেক উঁচু একটি জায়গায় দিগন্তবিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা দাঁড়িয়ে । অসাধারণ। খুব ভালো লাগলো ধন্যবাদ ভাই তুমি আজকে আমাকে যা দেখালে তাকে দেখার জন্য বারবার আমি ছুটে আসি এই নর্থ বেঙ্গল অপূর্ব অনেক অনেক ধন্যবাদ ।তিনচুলে তোমার কাছে আসা আমার সার্থক যেমন সূর্যোদয় সেরকম কাঞ্চনজঙ্ঘা আবার যেন আসি আমরা। গেস্টহাউসে সত্যি যেরকম আতিথেয়তা সেরকম সেরকম সুন্দর একটা জায়গা। আমার গাইতে ইচ্ছে করছিল আবার আসিব ফিরে তিঞ্চুলে গ্রামে।